রাজধানী ঢাকায় দিন দিন গাছপালা কমছে। কমছে জলাভূমি। গাছপালা কাটা হলেও লাগানো হচ্ছে কম। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) কিছু কিছু গাছ লাগালেও বেশির ভাগই বিদেশি এবং আগ্রাসী প্রজাতির। লাগানোর পরিবল্পনা রয়েছে চরাঞ্চলের ঝাউজাতীয় গাছও। এসব গাছ ঢাকার পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটি বিবেচনার চেয়ে সৌন্দর্যবর্ধনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে এসব গাছ ঢাকার তাপমাত্রা কমাতে সহায়তা করছে না।
অথচ ঢাকার লাল মাটিতে শাল, চালতা, সিন্দুরির মতো প্রজাতির গাছ ভালো হয়। পরিবেশের সঙ্গেও মানানসই। কিন্তু গত এক দশকে এসব প্রজাতির একটি গাছও কেউ লাগায়নি। ভবিষ্যতেও লাগানোর কোনো পরিকল্পনা নেই।
প্রকৃতিবিদ ও উদ্ভিদবিদেরা বলছেন, দেশজুড়ে চলছে দাবদাহ। রাজধানীতে এর প্রভাব অনেক বেশি। ঢাকায় গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে তা স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, ভবিষ্যতে এটি কতটুকু ফল বয়ে আনবে—এসব বিবেচনা করতে হবে। ভবিষ্যতে ঢাকার পরিবেশে আরও বেশি প্রভাব পড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনের নেতৃত্বে ঢাকা নগরে গাছের বৈচিত্র্য নিয়ে গত ডিসেম্বরে একটি গবেষণা হয়েছে। রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, এসব এলাকার ৫৮ শতাংশ গাছই বিদেশি প্রজাতির। শোভাবর্ধক উদ্ভিদ আছে ৩৩ শতাংশ।
গত বুধবার সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের দুই পাশে বনসাইয়ের সারি। নিকুঞ্জ থেকে র্যাডিসন হোটেল পর্যন্ত এসব গাছ রয়েছে। নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের লক্ষ্যে চীন ও তাইওয়ান থেকে এনে ২০১৭ সালে সওজ এসব গাছ লাগিয়েছিল। তবে পরিবেশ ও উদ্ভিদবিদদের প্রবল বিরোধিতার মুখে এসব দামি গাছ লাগানোর কাজ আর এগোয়নি।
কোথায় কোন গাছ লাগানো হচ্ছে
সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর বিজয় সরণি থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত সড়ক বিভাজকে গাছ আছে। এই পথে থাকা পদচারী-সেতুগুলোতে প্লাস্টিকের ঝুড়িতে লাগানো গাছ ঝুলে আছে। ২০১০ সালের পর পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্প’-এর (কেইস) আওতায় পদচারী-সেতুতে এসব গাছ লাগানো হয়। পদচারী-সেতুতে লাগানো বেশির ভাগ গাছ বাগানবিলাস।
এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল, বায়ুমানের উন্নয়ন; কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। তা ছাড়া পরিবেশ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী ২০১৯ সালে গণমাধ্যমেই প্রকল্পের নয়ছয় নিয়ে কথা বলেছেন। ব্যাপক সমালোচনার মুখে কেইস প্রকল্প শেষ হয়।
এ ছাড়া বিজয় সরণি থেকে ফার্মগেট পুলিশ বক্স পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকার সড়ক বিভাজকে গত বছর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ‘নগর সবুজায়ন’ প্রকল্পের অধীনে গাছ লাগিয়েছে, যার বেশির ভাগই চায়নিজ টগর, রঙ্গন ফুল, বাগানবিলাস।
প্রকল্পের পরিচালক মো. নুরুজ্জামান খান বলেন, প্রকল্পের আওতায় মোট ৯০ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি গাছ সড়কদ্বীপে। ফুটপাতে মূলত ছাতিম, কাঠবাদাম ও বকুল ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। ফুটপাতে প্রতিটি গাছ লাগাতে খরচ হয়েছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা।
এই প্রকল্পে পরামর্শকদের তৈরি হ্যান্ডবুক অন স্ট্রিট প্ল্যান্টিং: প্রিপেয়ার্ড ফর ঢাকা নর্থ সিটি করপোরেশন নামের বইটি ভুলে ভরা। যেমন আমলকীগাছের নাম থাকলেও অরবরইয়ের ছবি দেওয়া। ঝাউজাতীয় গাছের নাম থাকলেও ছবি দেওয়া অন্য গাছের। রাজধানীর জন্য এসব গাছ কতটা যুক্তিযুক্ত, সেই প্রশ্ন থাকছেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বইটি দেখে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিদেশি প্রজাতির একাধিক গাছ ও চরাঞ্চলের গাছ কীভাবে রাজধানীতে লাগানো হয়? প্রতিবেদন দেখেই গবেষণার ধরন বোঝা যাচ্ছে।
ঢাকায় কী ধরনের গাছ লাগানো দরকার
মাটির ধরন বিচারে লাল মাটির ঢাকার প্রধান গাছ শাল। এখনো রাজধানী লাগোয়া সাভারে শালগাছের সারি দেখা যায়। নেপালের তরাই অঞ্চল থেকে বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় পর্যন্ত লাল মাটির গালিচা।
মৃত্তিকাসম্পদ ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আফছার আলী প্রথম আলোকে বলেন, এখনো ঢাকায় ১০ ফুট মাটি খুঁড়লে নিচে লাল মাটি পাবেন। ফলে ঢাকায় শাল ও এর সহযোগী গাছগুলো ভালো হতে পারে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি গত বছর পাঁচ হাজার গাছ লাগিয়েছে বলে দাবি করেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পরিবেশ, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সার্কেল) মো. খায়রুল বাকের।
নগরীতে স্থানভেদে ভিন্ন ভিন্ন গাছ লাগানোর কথা বলেন উদ্ভিদবিদেরা। দক্ষিণ সিটি কি এসব আদৌ বিবেচনা করছে, এমন প্রশ্নে খায়রুল বাকের বলেন, ‘আমরা একজন বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ দিয়েছি। আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ীই এগোচ্ছি।
কেবল দুই সিটি নয়, রাজধানীর বিশাল এলাকাজুড়ে সরকারি-বেসরকারি ভবনগুলোয় গাছ লাগানোর কোনো পরিকল্পনার কথা জানা যায়নি। এ জন্য নীতিমালা থাকা জরুরি বলে মনে করেন নগর ও শিল্পাঞ্চলে সবুজায়ন নিয়ে কাজ করা স্থপতি মেহেরুন ফারজানা। তিনি বলেন, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নতুন নতুন ভবন হয়েছে। রাস্তা প্রশস্ত হয়েছে। অনেক গাছ কাটা হয়েছে। কিন্তু নতুন ভবনে সবুজ চোখে পড়ে না।
উদ্ভিদবিদেরা বলছেন, যেসব গাছের ডাল প্রসারিত হবে, বড় পাতা থাকবে, নগরে সেসব গাছ লাগানো উচিত। কারণ, বড় পাতা থাকলে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক রাখহরি সরকার বলছিলেন, ‘ঢাকা অঞ্চলে শত প্রজাতির গাছ আছে, যেগুলো আমরা তাপ প্রশমনে ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু সিটি করপোরেশনগুলো উদ্ভিদবিদদের পরামর্শ নিয়ে এসব গাছ নির্বাচন করছে বলে মনে হয় না।
ঢাকার হারানো গাছ আর জলাভূমি
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক শেখ মোহাম্মদ মেহেদি আহসান গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রায় তিন দশকে ঢাকার গাছের হার ২০ শতাংশ থেকে কমে এখন ৯ শতাংশে ঠেকেছে। ২১ শতাংশ জলাভূমি কমে হয়েছে প্রায় ৩ শতাংশ।
দেশের সবচেয়ে উষ্ণ মাস এপ্রিল। এ মাসের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো, দাবদাহ থাকে। কিন্তু ঢাকায় এপ্রিলে টানা দাবদাহ বেড়েছে।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ তাঁর গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলেন, গত বছর (২০২৩) ঢাকায় টানা ১৬ দিন দাবদাহ হয়েছে। এর আগের দুই বছরে ছিল যথাক্রমে ২ ও ৭ দিন। এবার গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ২৬ দিন টানা দাবদাহ হয়েছে।
ঢাকায় আগ্রাসী প্রজাতির গাছ
অধ্যাপক জসীম উদ্দিনের নেতৃত্বে ঢাকা নগরে গাছের বৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা হয়েছে। রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, এসব এলাকার গাছের ৫৮ শতাংশ প্রজাতিই বিদেশি।
বাংলাদেশ জার্নাল অব প্ল্যান্ট ট্যাক্সনমিতে প্রকাশিত ২০২১ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, সড়ক বিভাজকে ১৫ প্রজাতির গাছের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার ৯টিই ছিল আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতির।
অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলছিলেন, দেশে হাজারো প্রজাতির গাছ রেখে বিদেশি প্রজাতি দিয়ে নগরীতে সবুজায়নের চেষ্টা চলছে। এটা আত্মঘাতী। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।







